মার্কসীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের (সমালোচনাদর্শী তত্ত্ব) পরিদর্শন
মার্কসীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের ভূমিকা
ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুল গড়ে ওঠার পশ্চাতে একটি ইতিহাস
আছে। ১৯২৩ সালে জার্মানির ফ্র্যাঙ্কফুর্ট শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় Institute of Social Research। প্রতিষ্ঠানের প্রথম পরিচালক ছিলেন কার্ল গ্রুণবার্গ (১৮৬১ – ১৯৪০), ম্যাক্স হর্কহেইমার
(১৮৯৫ – ১৯৭৩)। দুজনেই ছিলেন ফ্র্যাঙ্কফ্যররটের Institute of Social Research এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। এই গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীকালে
ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুল নামে বৌদ্ধিক মহলে পরিচিত হয়, এবং কালক্রমে প্রখ্যাত
সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা কেন্র হিসাবে স্বীকৃত হয়। কার্ল গ্রুণবার্গ প্রাত্থমিকভাবে ভিয়েনা
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি সেখানকার
অধ্যাপনার পদ ছেড়ে স্থায়ীভাবে Institute of Social Research তথা ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলে প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসাবে যোগ এন। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট
স্কুল ছাড়াও তিনি Archives
for the History of Socialism and the Workers নামক গবেষণা পত্রিকারও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন।
পূর্বে এই গবেষণামূলক পত্রিকাটি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হত। কিন্তু
গ্রূণবার্গ ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলে যোগ দেওয়ার পর, পত্রিকাটিও ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুল
থেকে প্রকাশিত হতে থাকে।
ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল
মার্কসবাদ ও মার্কসবাদী চর্চা। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের সঙ্গে মস্কোর
মার্কস-এঙ্গেলস ইনিস্টিটিউশনের ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। শুধু তাই নয়, উভয় ইনিস্টিটিউট
যুগ্মভাবে মার্কস এঙ্গেলসের রচনাবালীর প্রথম খন্ডটি প্রকাশ করেন। গ্রুণবার্গ
ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলে যোগ দেওয়ার পর, বিশেষ করে তাঁদেরকেই এই প্রতিষ্ঠানিএর সঙ্গে
যুক্ত করেন, যাঁরা প্রতুক্ষ ও সক্রিয়ভাবে সামাজতান্ত্রিক তথা মার্কসীয় রাজনীতির
সঙ্গে এবং মার্কসীয় মতাদর্শের সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। যেমন কার্ল হ্রিটফগল, ফ্রনজ
বোর্কিনিউ, জুলিয়েন গুমপার্জ প্রভৃতি সরাসরি কমিউনিস্ট দলের সদস্য ছিলেন। এঁরা
ছাড়াও আরও কিছু সদস্য ছিলেন, যাঁরা সোস্যাল ডেমোক্র্যাট দলের সক্রিয় সুস্য ছিলেন।
এমন কি প্রথম দিকে কার্ল কর্সও প্রতিষ্ঠানের সদস্য ছিলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল,
প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কমিউনিস্ট দল ও সোস্যাল ডেমোক্র্যাট দলের সক্রিয় সদস্য,
স্ক্রিয়কর্মী ও সক্রিয় সমর্থকরা যুক্ত থাকা সত্ত্বেও Institute of Social Research এর কার্যকলাপ, অথবা Archives of the History of
Socialism and the Worker পত্রিকার কোন কার্যকলাপই দলীয় নির্দেশে বা দলীয় হস্তক্ষেপের দ্বারা সম্পাদন
করা হোত না। এই ব্যাপারে প্রতিষ্ঠান ও পত্রীকা উভয় মাধমই স্ব স্ব নিরপেক্ষতা বজায়
রেখে পরিচালিত হত। প্রকাশিত লেখা বা সেমিনারের মন্তব্য বা বিশ্লেষণের জন্যে লেখক
বক্তা নিজেই নিজের বক্তব্যের জন্যে দায়বদ্ধ থাকতেন। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলিএর
অন্যতম একতি কাজ হিল, বিভন্ন দেশের শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিক আন্দোলন বিষয়ে তথ্য
ভান্ডার গড়ে তোলা। সেই উদ্দেশ্যে এই সম্প্রকিত বিভিন্ন তথ্য এখানে সংগ্রহ করা হোত।
বিভিন্ন দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ তাঁদের নিজ নিজ গবেষণার জন্যে প্রয়োজনীয়
তথ্য, বিশেষ করে শ্রমিক সংগঠন ও আন্দোলন সংক্রান্ত তথ্য ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের
তথ্যভান্ডার থেকে সংগ্রহ করতেন। ১৯২৪ সালের ২২শে জুন Iinstitute of Social Research তথা
ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের উদবোধন হয়। উদ্বোধনী ভাষণে ইনিস্টিটিউটের মূল লক্ষ্য
ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কার্ল গ্রুণবার্গ বলেন, ফ্র্যাঙ্কফুর্ট, জার্মানের
বিশ্ববিদ্যালয়ে যেপদ্ধতিতে মার্কসবাদের শিক্ষাপ্রদান করা হয়, তার বিরোধীতা করে।
ত্নি উল্লেখ করেন, ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুল ভবিষ্যতে সরকারী কর্মচারী তোরী করার লক্ষ্য
নিয়ে এগিয়ে যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ম্যান্ডারীণ বা সরকারী কর্মচারী তৈরীর
কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠার লক্ষ্যে তা পাঠ্যসূচী বিন্যস্ত করেছে। কিন্তু গ্রূণবার্গ
সরাসরি মন্তব্য করেন এই প্রবনতাগুলির পরিবর্তন প্রয়োজন। এবং এই পরিবর্তনের জন্যেই,
গ্রুণবার্গ মার্কসবাদকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীতে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ জোর
দেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেন, নতুন প্রতিষ্ঠিত গবেষণা কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য হল,
মার্কসবাদকে কেন্দ্র করে নতুন এক বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্য
প্রতিষ্ঠা করা। এই ঐতিহ্য বা পরম্পরার লক্ষ্য হবে, সমাজজীবনে অনিবার্যভাবে সংঘটিত
বস্তুতান্ত্রিক ব্যবস্থার যে ধারাবাহিক রূপান্তর ও পরিবর্তন ঘটে চলেছে, ধারাবাহিক
গবেষণার মাধ্যমে তার কারণ ও পরিবর্তনের পদ্ধতিগুলিকে অনুসরণ করা, এবং এর ফলে
সমাজের মধ্যে কার্যকাঠামোগত বিবর্তন ও পরিবর্তনের ধারা ও সূত্রগুলিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে
জানার চেষ্টা করা। তিনি গবেষণায় আরোহী পদ্ধতি বা Inductive Method –এর ব্যবহারের উপযুক্ততা বিষয়ে মত প্রকাশ করেন।
কিন্তু তিনি এ’কথাও মনে করতেন, কোন গবেষণের চূড়ান্ত ফলাফল নির্দিষ্ট সময় ও পরিসরের
সীমিত পরিপ্রেক্ষিতে চূড়ান্ত ফল হিসাবে বিবেচিত হওয়া ঠিক নয়। তার চেয়ে তিনি মনে
করতেন গবেষণাজাত ফলাফলের যথার্থ অর্থ ইতিহাসের শর্তসাপেক্ষে আপেক্ষিকতায় বুঝতে
হবে। অবশ্য এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা দরকার। দ্বিতীয়
কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে অংশগ্রহণকারী কিছু সদস্য যেমন মার্কসবাদের বস্তুতান্ত্রিক
বিশ্লেষণ একরৈখিক বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও গ্রুণবার্গ তাঁর বস্তুবাদী
বিশ্লেষণকে কখনই একরৈখিক বস্তুতান্ত্রিকতার মাত্রায় সীমিত রাখেন নি। এমন কি
সমাজপরিবর্তনে অর্থনীতির অদ্বৈতবাদীতাকেও গ্রুণবার্গ সমর্থণ করেন নি। তিনি এ’কথাও
মনে করতেন না, যে মার্কসবাদের প্রয়োগ বিশ্বজনীনভাবে অপরিবর্তনীয় সূত্রানুসারে হয়ে
থাকে। অর্থাৎ তিনি বিশ্বাস করতেন মার্কসবাদ যেমন আমদানী করা যায় না, তেমনি তাকে
রপ্তানীও করা যায় না। গ্রূণবার্গের ব্যাখ্যায় মার্কসবাদ সতত বিকাশমান ও সচল। এবং
ভবিষ্যৎ গতিবিধির সবকিছু অতি নির্দিষ্ট ও সার্বিক সুনিশ্চিত হতে পারে না। তিনি
বলতেন, সামাজিক জীবনকে বোঝা যেতে পারে শুধুমাত্র একটি নির্দষ্ট আর্থিক ব্যবস্থার
মধ্যে শাসন ব্যবস্থায় যে নীতিগুলি অগ্রাধীকার পাচ্ছে, এবং যে নীতিসমূহের
বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা এখা দিয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে, অর্থাৎ তার যথাযথ আরোহী
মূলক বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে। সুতরাং উৎপাদন ব্যবস্থার তত্ত্ব
হিসাবে শুধুমাত্র মার্কসবাদকে ক্রিয়াশীল তত্ত্ব বলা যায়। অর্থাৎ মার্কসবাদ বিকশিত
করার জন্যে প্রয়োজন এ’কে আর্থিক উৎপাদনের তত্ত্ব হিসাবে গড়ে তোলা।
আসলে গ্রুণবার্গ তাঁর ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলে ঐতিহাসিক
বিশ্লেষণের নিরিখে তাত্ত্বিক কাঠামোর সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছিলেন। এবং তাঁর পত্রিকাতে
ধারাবাহিকভাবে ধনতান্ত্রিক অর্থণিতি, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পাশাপাশি
শ্রমিকসংগঠন এবং শ্রমিক আন্দোলনের ওপর বিভিন্ন প্রবন্ধ বা আলোচনা প্রকাশিত হত।
গ্রুণবার্গ তাঁর লেখায় প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে
সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলি পরম উতকর্ষতার দিকে এগিয়ে যায়। অনেক গবেষক গ্রুণবার্গের সকল
মন্তব্যকে মেনে নিতে পারেন নি। যেমন অনেক গবেষকই সব ধরণের সামাজিক “ফেনোমেনা”-কে
অর্থাৎ সকল ইন্দ্রিয়গোচরীভূত বিষয় সমূহকে বা বস্তুকে (এককথায় যাকে
প্রপঞ্চ বলা হয়) অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া বা অর্থনৈতিক
ব্যবস্থার দ্বারা নির্ধারিত, এ’কথা মেনে নিতে সম্মত ছিলেন না। তবুও তাঁরা
গ্রুণবার্গের গবেষণাকে এবং তাঁর ব্যাখ্যার অভিমুখকে যথাযথ মান্যতা দিতেন। বিশেষ
করে মান্যতা দিতেন কারণ অনেকের মতে গ্রুণবার্গ তাঁর গবেষণার মূল প্রস্তাবকে
মার্কসের অন্তর্দৃষ্টি নির্ভর রাজনৈতিক সামাজিক প্রেক্ষাপটের ভিতর থেকে বিশ্লেষণের
চেষ্টা করতেন।
১৯২৯ সালে
গ্রুণবার্গ অবসর গ্রহন করেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ম্যাক্স হর্কহেইমার। হর্কহেইমারের দৃষ্টিভঙ্গী গ্রুণবার্গের থেকে কিছুটা পৃথক হওয়ার কারণে,
ফ্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের মধ্যেও দৃষ্টিভঙ্গী ও গবেষণার অভিমুখের কিছু পরিবর্তন হয়।
এমন কি স্কুল কতৃপক্ষ বেশকিছু নতুন বুধিজীবীকে স্ক্রুলে যোগ দেওয়ান। এঁদের মধ্যে
উল্লেখযোগ্য ছিলেন এরিক ফ্রম, হার্বাট মার্কিউস প্রভৃতি। এ’ছাড়াও প্রতিষ্ঠানের
সুচনাপর্ব থেকেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ফ্রেডরিক পোলক, লিও লোয়েনথাল। গ্রুণবার্গের
যুগের পরবর্তীওকালে এই দুইজন স্কুলের বিভিন্ন বিষয়ে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে
থাকেন। গ্রুণবার্গ পরবর্তীকালে হর্কহেইমার পুর্ববর্তী বিষয়ভিত্তিক গবেষণার পরম্পরা
থেকে বেরিয়ে এসে, সামগ্রীকতাবিমুখ বিষয়গুলিকে গবেষণার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেন। এই
বিষয়গুলি ছিল অর্থনীতি, মনস্তত্ত্ব, ইতিহাস দর্শন প্রভৃতি।গ্রুণবার্গের চিন্তার
সঙ্গে যে হর্খেইমারের কিছু পার্থক্য ছিল সেটা স্পষ্ট হয়, হর্কহেইমারের দেওয়া একটি
বক্তৃতায়, যা তিনি দিয়েছিলেন ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্ক্রুলে। বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল The State of Contemporary Social
Philosophy and the Tasks of an Institute for Social Research ।
বক্তৃতার
মধ্যে দিয়েই গ্রুণবার্গের সঙ্গে হর্কহেইমারের চিন্তা-ভাবনাগত সাদৃশ্য ও
বৈসাদৃশ্যগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উভয়েই বিশ্বাস করতেন গবেষণাকে উদ্দেশ্যমুখী বা
সমাজমুখী করা প্রয়োজন, গবেষণা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, তাই
যে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গবেষণা কার্য পরিচালিত বা সম্পাদিত হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানের
একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা গবেষণার বিষয়বস্তু নির্ধারণে থাকা দরকার। গ্রুণবার্গ এবং
হর্কহেইমার, দুজনেরই আগ্রহ ও উৎসাহ বিষয় ছিল তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং
জ্ঞানতাত্ত্বিক অনুসন্ধান। তবে হর্খেইমারের অন্যতম আগ্রহ ছিল সামাজিক দর্শনকে সমাজের
ভবিষ্যৎ গতিপথ ব্যাখ্যার হাতিয়ার করে তোলার। তিনি প্রথাগতভাবে ব্যক্তি ও সমাজের
সম্পর্ক এবং তার সামাজিক ভিত্তি বিস্লেষণে সমাজ দর্শনের চিরন্তন প্রশ্নগুলির
তাতপর্যকে স্বীকার করে নিলেও, এই সকল বিষয়কে নিয়ে বিশুদ্ধ দার্শনিক অবস্থানকেও
তিনি গ্রহন করতে পারেন নি। কারন তিনি প্রথাগত দার্শনিকদের সামাজিক বিষয়ে অবস্থানকে
বিমূর্ত অবস্থান বলে মনে করতেন, এবং তা যে সামাজিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে অনেক
দূরে অবস্থান করে, সে বিষয়েও তাঁর সন্দেহ ছিল না। হেগেলীয় ভাববাদী অবস্থান থেকে
দূরে গিয়ে তিনি মনে করতেন, বিমূর্তবাদ থেকে বেরিয়ে এসে, বাস্তবের ভিত্তিতে
জঙানচর্চার বিষয়গুলিকে ঐক্যবদ্ধ করা দরকার। সেই কারণেই হর্খেইমার একই সঙ্গে
বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানচর্চার ওপর, পরিভাষার যাকে Interdisciplinary Study বলা হয়, তার ওপর বিশেষ আস্থাশীল ছিলেন। তিনি তাঁর
পূর্বসুরীর ন্যায় মনে করতেন না যে শুধুমাত্র বস্তুগত অবস্থা বা অর্থনীতি থেকেই
সামাজিক ইন্দ্রিয়গোচরীভূত বিষয় বা বস্তু সমর্কে জ্ঞান লাভ সম্ভব। কারণ তাঁর মতে এই
ধরণের মতবাদ কখনই মার্কসবাদ সম্মত নয়। তিনি চাইতেন ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের সঙ্গে
যুক্ত গবেষকরা সমাজের আর্থিক জীবন ও সমাজের মিথস্ক্রিয়ার সঙ্গে ব্যক্তির সাংস্কৃতিক
রূপান্তর ও ব্যক্তিসমূহের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের আন্তঃসম্পর্কগুলিকেও তাঁদের
গবেষণার অন্তর্ভূক্ত করুক। অর্থাৎ শুধু বিজ্ঞান শিল্প ও ধর্মের আধেয়কে সুস্পষ্ট
করে তোলার জন্যে গবেষণাকে প্রসারিত করতে হবে আইন , নৈতিকতা, ফ্যাশন খেলাধূলা
বিনোদন ইত্যাদি সহ ব্যক্তিমানুষের জীবনবোধের অভিব্যক্তিকে।
হর্কহেইমারের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যে তাঁর
মতে গবেষকগণের প্রধান জিজ্ঞাস্য বিষয় হবে,
“একটি নির্দিষ্ট দেশে নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন সক্রিয় গোষ্ঠীগুলির মধ্যেকার
আন্তঃসম্পর্কের ইন্রিয়গোচরীভুত বিষয়বস্তু সমূহ।“ এরই ভিত্তিতে গবেষক মূল প্রকল্প,
অনুমান বা Hypothesis হবে নির্দিষ্ট আর্থিক অবস্থায় বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলির
অবস্থান তাদের সদস্যদের সক্রিয় মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো ইত্যাদি কিভাবে সদস্যদের
চিন্তা ও কার্যধারাকে প্রভাবিত করে। গবেষণার ক্ষেত্রে হর্কহেইমার যে তিনটি বিষয়ের
ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন সেগুলি হলঃ
Ø ইন্টার ডিসিপ্লিনারি গবেষণার (আন্তঃবিষয়ক গবেষণা)
মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রশ্নগুলির পুনঃ মূল্যায়ন বা সংজ্ঞায়ন।
Ø মার্কসের তত্ত্ব আলোচনায় ও বিশ্লেষণে পূর্বকার
গবেষকগণ যে যে দিকের প্রতি কম গুরুত্ব দিয়েছেন, বা আদৌ কোন গুরুত্ব প্রদানের
প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন নি, সেইগুলির দিকে বিশেষ গুরুত্ব ও নজ্র দেওয়া।
Ø নতুন বিশ্লেষণ কাঠামোর সহায়তায় উদ্ভাবিত তত্ত্বের
সাহায্যে বিভিন্ন বিষয়ের আন্তঃসম্পর্কসমূহকে নতুনভাবে উপলব্ধি করা, এবগ্ন তার
দ্বারা সমাজ, অর্থনীতি সংস্কৃতি ও সচেতনার পুনরুৎপাদন ও রূপান্তরের সম্ভাবনাকে
বাড়িয়ে তোলা।
এরপরের ইতিহাস ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের ইতিহাসে বিশেষ তাতপর্যপূর্ণ। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের প্রাতিষ্ঠানিক
পরিকাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে ১৯৩০ ও পরে ১৯৪০ সালে প্রথমে জেনিভায় পরে নিউইয়র্কের
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরীত করতে হয়। বলা হয় এই পর্বেই ফ্র্যাঙ্কফুর্ট
স্কুলের কার্যাবলী পৃথিবীতে উজ্জ্বল চিহ্ন হিসাবে পরিচিত হয়। ১৯৩০-৩২ সালের মধ্যে
(হর্কহেইমারের যোগ দেওয়ার তিন/চার বছরের মধ্যে) জার্মানীতে নাৎসিবাদের উদ্ভব ঘটে।
এবং প্রথম থেকেই ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের গবেষকরা ক্রমেই তাদের জীবন সম্পর্কেও
সন্ত্রস্ত্য হয়ে পড়েন। ফ্যাসিস্ত আক্রমণের মুখে, একদিকে তাঁদের স্বাধীন
চিন্তা-ভাবনার পথগুলি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে যেমন রুদ্ধ হয়ে যায়, তেমনি তাঁদেরকে
প্রাণের ভয়ে দ্রুত জার্মানী ত্যাগ করে, আমেরিকায় চলে যেতে প্রায় বাধ্য হন।
ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের গবেষকদের বিভিন্ন আলোচনা এবং
প্রকাশনের মধ্যে যে প্রশ্নগুলি অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়েছিল, তা’হল বিংশশতকের
সামগ্রীক সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে মার্কসবাদের বিষয়গত বশ্লেষণের মধ্যে
কিভাবে বিন্যস্ত করা হবে? অর্থাৎ বাস্তব পরিস্থিতিতে মার্কসীয় তত্ত্বের বিশ্লেষণের
অভিপ্রায় বা উদ্দেশ্য কি হবে? মার্কসীয় মতবাদ একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবজনোচিত
অভিপ্রায় নিয়ে বৈপ্লবিক মতবাদের প্রচারে নেমেছিল। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল
পুঁজিবাদের যে কোন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। একটি বিষয়
নিশ্চিতভাবে স্বীকার করতেই হবে যে, মার্কসীয় মতবাদ বিশ্বব্যাপী এক উত্তাল
পরিস্থিতির মধ্যে এক বিশিষ্ট্য বৈপ্লবক পন্থা হিসাবে উঠে এসেছিল। কিন্তু পরিবর্তীত
পরিস্থিতিতে সেই বৈপ্লবিক পন্থার রাজনীতি এক বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে পসচিম ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে বাম্পন্থী শমিক
সংগঠনগুলির আন্দোলন প্রচেষ্টার ব্যার্থতা, জার্মানিতে সংস্কার পন্থীদের হাতে
বামপন্থী শ্রমজীবী আন্দোলনের ভেঙ্গে পড়া, এবং মস্কোর সময় উপযোগী পরামর্শ থেকে
সম্পূর্ণ বিরত থাকা, ইত্যাদি সবকিছু বাম আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এর ওপর
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অসক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায়
উত্তরসুরী হিসাবে স্ট্যালন ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসার পর থেকেই শুরু হয়, সোভিয়েত
সমাজতন্ত্রবাদের অতিকন্দ্রীকতাজাত অবনতি এবং অন্যদিকে ইতালী ও জার্মানিতে
মার্কসবাদী সমাজতান্ত্রিক দলগুলিকে প্রায় বিতাড়িত করে, প্রতিষ্ঠিত হয় পরিপূর্ণ
স্বৈএওতান্ত্রিক ফ্যাসীবাদ ও নাতসীবাদ। ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে উভয় রাষ্ট্রে প্রধান
চালিকা শক্তি ছিল উগ্র যুদ্ধ উন্মোত্ত জাতীয়াতবাদ। পরিবর্তনের এই বিশ্বব্যাপী
পরিপ্রেক্ষিতে স্বভাবত মার্কসবাদী চন্তাবিদদের শুধু উদবিগ্নই করে নি, মার্কসবাদের
ভবিষ্যৎ নিয়েও রীতিমত চিন্তিত করে তুলেছিল। শুধু তাই নয় মার্কসীয় চিন্তাবিদদের
মধ্যে যাঁরা গভীরভাবে বিশ্বাস করত যে ঐতিহাসিক বস্তুতান্ত্রিকতায় সমাজব্যবস্থায়
উত্তোরণ একটি অনুবার্য ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, অথবা যাঁরা বিশ্বাস করতেন সুসংগঠিত
কমিউনিস্ট দলের দ্বারা যথার্থ মার্কসীয় মতবাদ প্রচার সম্ভব, তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে
পরিবর্তীত অবস্থায় বভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়েন।
ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের সাথে জড়িত প্রায় সকল অধ্যাপক
গেষকই ছিলেন, তাঁদের চিন্তা ও গবেষণার পরিপ্রেক্ষিত থেকে মৌল্বাদী বলশেভিক দলের
বিরোহী। তাঁরা পুঁজিবাদ ও সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা, উভয়কেই অপছন্দ করতেন,
এবং উভয় শাসনব্যবস্থার পদ্ধতি থেকে সম্ভাব্য দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। এঁদের মধ্যে
বেশীর ভাগই ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালের নয়া বামপন্থী পথে অনুসরণে মার্কসীয় চিন্তার এক
ব্যাখ্যায় আকর্ষিত হয়েছিলেন এবং তারই ভিত্তিতে নবউদ্ভূদ বিষয় ও সমস্যাগুলিকে
ব্যাখ্যাকরার চেষ্টা করে এবং এই প্রসঙ্গে তাঁরা উল্লেখ করেন পূর্বের নৈষ্ঠিক
মার্কসীয় চিন্তায় আমলাতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রের কথা সম্পূর্ণ অনুপস্থত ছিল।
ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক-বিশ্লেষকদের মার্কসবাদ সম্পর্কিত সাধারণ সমালোচনাত্মক
বিশ্লেষকও বলা হয়ে থাকে। আসলে তথাকার অধ্যাপক ও গবেষকরাও থিক এইভাবেই
তাঁদের উদ্যোগকে চিহ্নিত করেন। তবে এই প্রসঙ্গে এটাও উল্লেখ করা দরকার, যে, এই
স্কুলের সকল গবেষক ‘নয়া মার্কসবাদী’ বিশ্লেষণ পদ্ধতি, এই নামে সহমত ছিলেন না। তবে
সবার মধ্যে এই মতানৈক্য ছিল না।
ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা গবেষক হর্খেইমার,
এডোনো (Adono), মারক্যুইস (Marcuse) প্রমুখ ছিলেন এই সমালোচনাত্ত্বক
পর্যালোচনার উদ্ভাবক। এই পর্যালোচনার সবিস্তারে বর্ণনায় লক্ষ্য করা যাবে, যে
বিভিন্নজনের পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যার মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যগত সামঞ্জস্য ছিল।
পর্যালোচকগণ নব উদ্ভাবিত বাস্তব অবস্থার পর্যালচনার ধারণাকে সম্প্রসারিত ও
প্রসারিত করার ক্ষেত্রে যেমন ক্কান্ট বর্ণিত “কারণ” ও সে সম্পর্কে জ্ঞান আহরণের
সম্ভাবনার প্রয়োগযোগ্যতা বিশ্লেষণ
করেছিলেন তেমনি হেগেল বর্ণিত বাস্তব অবস্থার প্রতিফুনে কিভাবে দৃষ্টিগোচরে আসে,
সেই বিষয়ের সঙ্গে নিজের সংযুক্তির তাতপর্যকে
আলোচিত বাস্তব সময়ের মধ্যে ব্যক্তিরা বিশ্লেষণ করেছিলেন, তা’ও ব্যাখ্যা
করার চেষ্টা করেন। এবং এই বিস্তৃত প্রেক্ষাপটের মধ্যেই সেই সময়ের পুঁজিবাদী
অর্থনীতির দৃষ্টিকোণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা পরিবর্তীত অবস্থায় মধ্যেকার সকল জটিলতাকে তাঁদের আলোচনার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করেন,
যেগুলির পরিপ্রেক্ষিতের ওপর তাঁদের সমালোচনামূলক নয়া মার্কসীয় মতাদর্শ নির্ভর
করেছিল। তাদের আলোচনার মধ্যে উঠে এসেছিল প্রচলিত মার্ক্সীয় ব্যবস্থার মধ্যেকার
গোপন এবং বৈধ অপ্রতি-সম ক্ষমতার সম্পর্ক। তাঁরা বিশেষভাবে সন্ধ্যা করতে চাইছিলেন,
সেই সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের চিন্তার মধ্যে কি ধরণের সামাজিক
স্বার্থ, দ্বন্ধ্ব এবং অসংগতি বা প্রভেদ প্রতিফলিত হচ্ছিল বা তারা ব্যক্ত করছিল।
এবং কিভাবে তারা প্রচলিত ব্যবস্থার কর্তৃত্বের মধ্যে থেকেও উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকত।
গবেষকদের আশা ছিল, এই পরিপ্রেক্ষিতের অভিজ্ঞতা লব্ধ জঙান তারা অর্জন করতে পারলে
প্রচলিত ব্যবস্থার কর্তৃত্বের শিকড়ের সন্ধান তারা পাবেন, এবং তারা অনুমান করতে
পারবে, এই অবস্থা মতাদর্শকে তলায় তলায় কতটা ক্ষতি ক্রেছে, এবং কিভাবে এই ক্ষয়কারক
প্রভাব থেকে মতাদর্শগত চেতনাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা যায়।
জার্মান ও ইতালীতে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের উদ্ভবের পর
থেকে অথবা বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ ও চল্লিশ দশকে স্কুলের ফ্যাকাল্টির বিতাড়ণ, এর
স্থানান্তরের পক্ষে গত্যন্তরহীন সিদ্ধান্ত ছিল, এবং এর পর থেকেই, রাজনীতির
বিশ্লেষণের জগতে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের উত্থান নতুনভাবে ঘটে। তবে নাৎসিবাদের
জন্মভূমি জার্মান থেকে উচ্ছেদের ফলে, স্কুলের গবেষকদের যে অসুবিধাটা হয়েছিল তা হল জার্মানির
বাস্তব অবস্থার পর্যবেক্ষনের সুযোগ তাদের কাছে ছিল না। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের
প্রতিটি গবেষক বিশ্বাস করতেন যে তাঁদের গবেষণা, বিভিন্ন স্থানের পরিবর্তনকামী
প্রতিটি মানুষকে অন্তত নতুনভাবে চিন্তা করতে প্রভাবিত করবে, এবং এর প্রভাবে নতুন গবেষকদের মধ্যেও
তাদের বিষয়বস্তু সম্পর্কে নতুন করে চিন্তা
করার ইচ্ছা ক্রমপুঞ্জিত আকারে বৃদ্ধি পাবে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তাঁদের এটাই ছিল
প্রত্যাশিত অবদান। জার্মান থেকে চলে আসার ফলে অবশ্যই কিছু গবেষণার ধারাব্বাহিকতা
থেকে গবেষকরা বিচ্চগিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এবং ত্র ফলে অবশ্যই কিছু ক্ষতি হয়েছিল। যেমন
হর্কমেয়ারের দর্শনমূলক গবেষণা The Authoritarian Personality বা অ্যাডনিরির সমাজতত্ত্বমূলক গবেষণা Dialectics of Enlightenment প্রভৃতির বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতের বিচ্ছিন্নতা, আসলে
জ্ঞান জগতকেই ক্ষতিগ্রস্থ করেছিল। তাঁদের পরিযায়ন শুধু তাদের নিরবিচ্ছিন্ন
জ্ঞানচর্চাকেই ক্ষতিগ্রস্থ করেনি, ফ্যাসিস্ত আক্রমনের সূত্রে বিভিন্ন মাধ্যম দিয়ে
তাদের আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবের মৃত্যু সংবাদ আসতে থাকে। তাঁরা উপলব্ধি করেন জার্মান
ইতালী ও দখলীকৃত রাষ্ট্র সমূহে এক অপরিচিত, স্বভাববিরুদ্ধ এবং মানবিকতার পক্ষে
ভয়ানক সংস্কৃতির উত্থান ঘটেছে। মূল ক্ষেত্রভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে আমেরিকার নিউইয়র্ক
শহরে পরিযায়নের ফলে, গবেষণার বিষয় ও প্রকরণের পরিবর্তনো অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ল।
জার্মান পরম্পরা থেকে অ্যাংলো-আমেরিকান পরম্পরায় কিছু বিশেষ পার্থক্য ছিল। যেমনঃ ১)
অ্যাংলো-আমেরিকান দর্শনের গভীরতা এবং অন্তর্দৃষ্টির ব্যাপ্তির জার্মান পরম্পরা
থেকে অবশ্যই কম ছিল; ২) আমেরিকার গবেষকদের মধ্যে প্রায়োগিক গবেষণার প্রবনতা অনেক
বেশী। তাই দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতি তাদের আগ্রহ যেমন কম, তেমনি এক পর্যালোচনা
বা সমালোচনার প্রবনতাও তাদের মধ্যে কম।
ডেভিড ম্যাকলেনান (David McLellan) তাঁর Marxism After Marx: An Introduction : 1979 গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের
গবেষকদের ( যাঁদের সমালোচনাব্দী তাত্ত্বিকও বলা হয়) অন্যতম লক্ষ্য ছিল দৃষ্টবাদের
সমালোচনা। দৃষ্টবাদ উল্লেখ করে যে একমাত্র বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দ্বারাই, বাস্তব
অবস্থার যথার্থ বাঙ্কময়তার সন্ধ্যান পাওয়া যায়। দৃষ্টবাদ সরাসরি কুসংস্কার, ধর্ম
বা রূপকবিদ্যার বিরোধীতা করে এবং উল্লেখ করে, যে এইগুলি প্রাক-বৈজ্ঞানিক ধারুণার
এক একটি রূপ। তাঁরা বিশ্বাস করতেন সমস্ত জ্ঞানের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে জ্ঞান
ও অভিজ্ঞতার দ্বারা সংগৃহীত তথ্যের উপর। অর্থাৎ যা দৃষ্টিশক্তির দ্বারা পরিলক্ষিত
হয়, যার অস্তিত্বের শব্দ শোনা যায়, যা ঘ্রাণশক্তির দ্বারা উপলব্ধি করা যায়, যার
স্বাদ গ্রহণ করা যায় এবং যা স্পর্শ করা যায়, তাই একমাত্র জ্ঞানের উৎস হওয়ার যোগ্য।
সুতরাং দৃষ্টবাদীদের মতে অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞানই একমাত্র সমাজবিজ্ঞানীদের সামাজিক
বাস্তবতা সম্পর্কিত জ্ঞানের উৎস হতে পারে। পুঁজিবাদের প্রথমিক উত্থানের কালে
দৃষ্টবাদ হয়ে উঠেছিল গবেষণের সর্বাপেক্ষা প্রগতিশীল পদ্ধতি। মারক্যুস উল্লেখ করেন
যে সাম্প্রতিককালে সমাজবিজ্ঞানীগণের ক্রমবর্দ্ধিত ঝোঁক হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক
বিজ্ঞানের পদ্ধতি সমূহকে অনুসরণ করা। তার পরোক্ষ ফল হল তারা এবং তাদের গবেষণা
ক্রমেই সমাজব্যবস্থার “নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রে“ পরিণত হয়ে পড়ছে। অথচ তাদের কাছে,
অর্থাৎ গবেষকদের কাছে সমাজের প্রত্যাশা ছিল যে, গবেষকরা মানব জাতির দীপায়নের
সম্ভাব্যতা উদ্ভাবনের চেষ্টা করবে। এমন কি তাদের গবেষণার বিষবস্তু বা ফলাফলের
নৈতিকতা বিচারকেও পরিহার করা হত, অর্থাৎ সাধারণের মধ্যেকার সমালোচনার অভিমুখকেও
তারা অপ্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেন। ফলে আধুনিক দৃষ্টবাদের লক্ষ্য হয়ে ওঠে সামাজিক ও
রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, এবং দীপায়নের লক্ষ্যে সামাজিক প্রগতিকে
রূদ্ধ করা। ম্যাকলেনান এই প্রসঙ্গেই উল্লেখ করেন, যে সমালোচনা দর্শীরা কোন কোন সময় এ’ও মন্তব্য করেন যে, মার্কস নিজেও
অনেক ক্ষেত্রেই উপরিকাঠামোর মাত্রাগত গুরুত্বের দিকে বা তার আধিপত্য বিস্তারের
ক্ষমতার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নজর দেন নি।
দেশান্তরের ফলে স্বাভাবিক কারণেই প্রাথমিক পর্বে
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি এক চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়ে। যার ফলে দেশান্তরের পরের
পর্বেই, জার্মানে শুরু করা বেশ কিছু প্রকল্পকে বাতিল করতে হয়। এদের মধ্যে অন্যতম
ছিল Studies in Philosophy and Social
Science । এছাড়াও গবেষণার ক্ষেত্রগত পরিবর্তনের ফলে বেশ কিছু গবেষক তাদের গৃহীত
প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হয়। আবার আমেরিকার সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির
কথা বিবেচনা করে, অনেক প্রকল্পের রাজনৈতিক অবস্থাঙ্গত পরিপ্রেক্ষিতকেও গবেষকদের
পরিবর্তন করতে হয়। এ’সবের বাইরেও আরও একটি
বিষয় ছিল, যা গবেষণার অভিমুখের পথে কিছুটা হলেও অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল। তা ছিল
বৌদ্ধিক সমস্যা। যে সব ধারণা বা মতাদর্শকে ভিত্তিকরে গবেষণ প্রতিষ্ঠান্টি গড়ে
উঠেছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তীকালে যেগুলি গবেষণার বিষয় হিসাবে তাদের সামাজিক,
রাজনৈতিক পর্যাপ্ততা, অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল। প্রাক-বিশ্বযুদ্ধকালীন অবস্থায় যে
সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন নতুন করে এখানে শুরু হয়েছিল, সেই নয়া আশাবাদ বিশ্বযূদ্ধত্তোর
কালে অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছিল। তবুও যে
বিষয়টি হারিয়ে যায় নি, তা’হল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বা তার নিকটস্থ
গবেষকদের গবেষণার বিষয় বৈচিত্র্য। যেমন বিভিন্ন গবেষণার মধ্যে কয়েকটি হলঃ ১)ধনতন্ত্র
ও পুঁজিবাদের পরিবর্তীত অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ তত্ত্ব নির্ধারণ,২) দ্বিমাত্রিক
বিশ্বযদ্ধত্তোর পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ, ও
তাদের মধ্যে তুলনামূলক পরিপ্রেক্ষিত স্থাপনের চেষ্টা, ৩) পুঁজিবাদী
ব্যবস্থার নব জাগরণ এবং এই নব জাগরণের পশ্চাতে বৃহৎ পুঁজিবাদের নয়া
যান্ত্রিকতাবাদের পুনররায় উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা, ৪) নয়া পুঁজিবাদের
সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল, ৫) শ্রমজীবীর সংস্কৃতি বা গণ-সংস্কৃতির ধরণ,
ইত্যাদি। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট গবেষণ প্রতিষ্ঠানের গবেষক প্রশাসক, সকলেই একটা কথা
স্পষ্টই বুঝতে পেরেছিলেন, যে ফ্যাসিবাদ, এমন এক ব্যক্তিকেন্দ্রীক শাসন ব্যবস্থা যা
শুধু কোন্রকম সমালোচনা সহ্য করে না, তাই নয়, এই শাসন ব্যবস্থার ভিত্তিতে আছে শুধু
ব্যক্তিকেন্দ্রীক কর্তৃত্ববাদ, যা কোন এক বা কয়েকজন ব্যক্তিকে সকলের কাছে প্রায়
পূজ্যতুল্য করে তোলে। কমিউনিস্ট দলের সপ্তম কংগ্রেসের সভায় যোগদান করেও,
ফ্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের প্রশাসক গবেষক, তাঁদের একটি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন নি,
তা’হল, ব্যক্তিমানুষের নিয়ন্ত্রণহিন কর্তৃত্বই হল, বর্তমান পৃথিবীর রাজনীতির এবং
অর্থনীতির মূল কথা। তাঁরা বিশ্বাস করতেন বর্তমান পরিস্থিতিতে দিউরোপে সমাজতান্ত্রিক
বিল্পব অসম্ভব। পুঁজিবাদ যে নতুন প্রায় স্থায়ী সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে, সেখানে
গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ও যুক্তিসংগত পরিনতি হচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রীক স্বৈরাচারীতার
মাধ্যমে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা। বর্তমান
পরিস্থিতিতে একচেটিয়া পুঁজির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে আর্থিক পুঁজি বা
ফিন্যান্স পুঁজি। ফিন্যান্স পুঁজির সর্বাপেক্ষা প্রতিক্রিয়াশীল সংরক্ষক হল, স্বৈরতান্ত্রিক
শাসনব্যবস্থা। অর্থিক পুঁজি তার বিনিয়োগের জন্যে যত না বাজারের ওপর নির্ভর করত,
তার থেকে বেশী গুরুত্ব দিত পুঁজি বিনিয়োগের পরিকল্পনার ওপর। সামাজিক দায়বদ্ধহীন
ফিন্যান্স পুঁজির একমাত্র দায়বদ্ধ তার বিনিয়োগকৃত পুঁজির প্রত্যাবর্তনে।
এই বিষয়ে অন্যতম একটি গবেষণা গ্রন্থ ছিল থিওডোর
অ্যাডোর্ণা এবং ম্যাক্স হর্কমেয়ারের Dialectics of Enlightenment বা দীপায়নের দ্বন্ধ্ব। গবেষণার মূল আলোচ্য বিষয় ছিল, অষ্টাদশ-উনবিংশ শতাব্দীতে
ইউরোপের নবজাগরণ বা দীপায়নের পরেও সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মানব সভ্যতাকে
কিভাবে নতুন ধরণের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার মধ্যে নিয়ে যায়, তার অনুসন্ধান। মানুষ একটা সময়ে নিজের ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে, বিজ্ঞান ও
যুক্তিবোধকে ভুলে গিয়ে বা তার প্রতি আস্থা হারিয়ে, প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও
রাষ্ট্রকেন্দ্রীক দর্শনের প্রতি তাদের বিশ্বাসের ভিতকে দূর্বল করে ফেলে। এর অর্থ
এই নয় যে ধনতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে বিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিক চিন্তা সম্পূর্ণ
বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আসলে পুঁজিবাদ যত একচেটিয়া পুঁজিবাদে পরিণত হচ্ছিল, ততই
বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও পদ্ধতিগুলো ক্রমাগত বেশি বাশি করে প্রকরণবাদী, বশ্য ও
যান্ত্রিক হয়ে উঠছিল। তারি ফলশ্রুতিতে বিজ্ঞান, তার চিন্তা ও পদ্ধতিগুলি, শাসকের
কাজ থেকে প্রাপ্ত ব্যবস্থায় সম্পর্কিত আদেশ ও স্বার্থপালনে তৎপর হয়ে উঠতে বাধ্য
হয়েছিল। তারা তাদের সামাজিক অন্তর্দৃষ্টি ও নিজের অর্জিত জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে
সমালোচনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আবার অন্যদিকে শাসকের আগ্রাসী পুঁজিবাদী
মানসিকতার কারণে বিজ্ঞান, বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও প্রযুক্তি প্রচলিত উৎপাদন ব্যবস্থার
এবং পুঁজি নিয়ন্ত্রন কারীদের প্রায় দাসত্ব স্বীকার করে ইতে বাধ্য হয়। একটা বিষয়ে
এই সময় সচেতনতা বৃদ্দধি পায়। ব্যক্তি উপলব্ধি করতে শুরু করে যে, মানুষের
যুক্তিবোধ, তার মানসিক অনুভূতি আত্মমগ্ন সামাজিক গুণাবলী এবং প্রকৃত উভয়েই গণিত
বিনিময় মূল্যের হিসাব এই সমস্ত কিছু তার মধ্যেকার নান্দনিকতাকে কেড়ে নিচ্ছে। কেবল
ব্যক্তির মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে, তার বিনিময় মূল্যের পরমানের দ্বারা। ব্যতকি তার
স্মাজ জীবনে উপলব্ধি করে, তার সামাজিক বিনোদনের ক্ষেত্রগুলিও, ক্রমেই বিনোদন
উৎপাদনের কারখান্য পরিণত হচ্ছে। সবকিছুর বান্যিজিক মূল্যবোধ তাই বিজ্ঞানের অগ্রগিতির বিন্দুমাত্র সহায়তা
শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের জোটে নি। ফলে যুক্তিবাদ বা আলোকিত সংস্কৃতির চিন্তা
ক্রমেই ‘মিথ’ হয়ে পড়ে অথবা অযৌক্তিকতার দ্বারা পরিচালিত হতে শুরু করে। দিপায়ন বা Enlightenment একটা সময়ে মানুষকে, ১)অযৌক্তিক রহস্যময়তার আধ্যাত্মিক
ভয় থেকে মুক্তি দিয়েছিল, ২) বিজ্ঞান মানুষকে বোঝাতে চেয়েছিল, কোন কিছুই রহস্যময়
নয়।আমরা যা দেখতে পাই না, তাকে রহস্যাবৃত
মিথ্যা উপলব্ধির চেষ্টা অপেক্ষা, তাকে হয় লক্ষ্য করে উচিৎ এবং তাকে অবজ্ঞা করা
উচিৎ, অথবা উপলব্ধির বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করা দরকার, ৩) ব্যক্তি ও
ব্যক্তি সমাজের উচিৎ বিজ্ঞানের সাহায্যে প্রকৃতির বহস্য উন্মোচন করা, এবং তাকে
শাসন করা, ৪) ব্যক্তি সমাজের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকগুইর মগণসংস্কৃতির
উপকরণগুলিকেও বানিজ্যিক দ্রব্যে পরিনত করে, সাংস্কৃতিক সৃষ্টিশীলতার ক্ষমতাকেও হত্যা
করছে। শিল্পের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে, উপভোগের প্রক্রিয়াকেও বদল করতে হচ্ছে। শিল্প
তার নিজস্ব প্রতিবাদের ধরণকে হারিয়ে ফেলে নিতান্ত বিনোদনে পরিনত হচ্ছে। তাই
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রয়োজন এমন এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, যা সংস্কৃতি কারখানাকে সমন্বিত
করে জ্ঞানকে ব্যক্তিত্ব ও সমাজবিকাশের প্রধান চালিকা হিসাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে
সক্রিয় ভূমিকা নেবে, এবং সামাজিক মান ও যুক্তিবোধের মধ্যে দিয়ে সমতা প্রতিষ্ঠা
করা।
ফ্র্যাঙ্কফুর্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশ সমালোচনাত্মক
তাত্ত্বিক ছিলে আদপে দার্শনিক। তাই তাদের লেখায় বার বার আলোচিত হয়েছে অতীত ও
বর্তমানের দার্শনিকদের চিন্তা। এদের একটি প্রচেষ্টাও ছিল বিভিন্ন দার্শনিকের
চিন্তাগুলির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সংশ্লেষ করা, যেমন কান্ট, হেগেল, মার্কস হ্বেবার,
লুকাস, ফ্রয়েড প্রভৃতির চিন্তার মধ্যে সামাজিক বাস্তবতাকে সংশ্লেষ করে, তাঁরা এক
ভিন্ন পথের অনুসন্ধানে ছিলেন। অর্থাৎ বভিন্ন দর্শ্নের মধ্যেকার আন্তঃশৃঙ্গখলাকে
গবেষণার বিষয়বস্তু করে তোলাই ছিল তাঁদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে তাঁরা
সংশ্লেষণের বিষয় হিসাবে সেই দার্শনিক
প্রসঙ্গগুলির ওপর নিজেদের নজরকে নিবদ্ধ করেছিলেন , যেগুলির প্রধান উপজীব্য ছিল
সমাজের পুনর্গঠনে এবং পরিবর্তনের মূল ধারাকে অনুসন্ধান; অথবা সমাজব্যবস্থার
সাংস্কৃতিক ধারার অনুসন্ধান; কিংবা ব্যক্তি, সমাজ ও প্রকৃতির মধ্যেকার সম্পর্কের
বিশ্লেষন।
তবে সমালোচনাত্মক তত্ত্বের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ
পর্যবেক্ষন ছিল সমাজ পরিবর্তন বা বিশ্লেষণে মার্কসবাদের তত্ত্বগত অবস্থান
সম্পর্কে। স্ট্যালিনের নের্তৃত্বে মার্কসবাদ একটি দমনকারী মতাদর্শের প্রকাশ রূপে
প্রতিভাত হলেও, সমাজ ও অর্থনীতির পরিবর্তন সম্পর্কে মার্কস যেভাবে ইতিহাসকে
বিশ্লেষণ করেছেন, তা সামগ্রীকভাবে বা প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য বলে, সমালোচনাত্মক
তাত্ত্বিকরা মনে করতেন না। কারণ তাঁরা উল্লেখ করেন, যে সমাজের ঐতিহাসিক পুঁজিবাদী
অর্থনীতির পরিবর্তনের সূত্রে, কিভাবে
ফ্যাসিবাদ বা স্ট্যালিনবাদের ন্যায় ফেনোমানার উদ্ভব হতে পারে, সে উত্তর মার্কসবাদ
থেকে সরাসরি পাওয়া যায় না। কিন্তু হ্বেবার বা ফ্রয়েডের বিশ্লেষণ থেকে আমরা অনুমান
করতে পারি, কেন মার্কসীয় সমাজতাত্ত্বিক বিপ্লবের সমূহ সম্ভাবনা এবং বিষয়গত ও
বিষয়ীগত প্রেক্ষাপট থাকলেও, পশ্চিম ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হবে না। সমালোচনাত্মক
তাত্ত্বিকদের একটি প্রবনতা ছিল মার্কসবাদের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োগযোগ্যতাকে
বিচার করা , এবং সম্ভাব্যস্থলে অমার্কসীয় চিন্তার প্রায়োগিকতাকে পরীক্ষা করা। এর
অর্থ এই নয় যে তাঁরা মার্কসবাদকে অনান্য দর্শনের নিরীখে ছোট করতে চাইতেন, বরং
তাঁরা দাবি করতেন যে, এর মাধ্যমে তাঁরা মার্কসীয় তত্ত্বের ত্রুটিগুলির সংশোধনের
মাধ্যমে তাকে পুনরায় প্রাণবন্ত করে তুলতে চাইতেন। অর্থাৎ বিষয়টিকে সংক্ষিপ্ত আকারে
যদি বিন্যস্ত করতে হয়, তাহলে সমালোচকনাত্মক তাত্ত্বিকদের লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক
অর্থনীতির ক্ষেত্রে মার্কসীয় অবদানকে স্মরণ করেও এ’কথা উল্লেখ করা যে বর্তমান সামাজিক রাজনৈতিক
বাস্তবতাকে বোধগম্য করার ক্ষেত্রে মার্কসীয় ব্যাখ্যা যথেষ্ঠ নয়। কারণ ইতিমধ্যে রাষ্ট্রের ব্যাপ্তি বহুগুণ বেড়ে
গেছে, বিশেষ করে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্র শুধু জাতীয় ক্ষেত্রে নয়,
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের ভিত্তি ও
উপরিকাঠামোর মধ্যেকার সংবদ্ধ সম্পর্কের গুণগত ও পরিমানগত পরিবর্তন ঘটেছে। এই
সঙ্গেই পরিবর্তন ঘটেছে শাসন-সংস্কৃতির, এবং শিল্প সংস্কৃতির। রাষ্ট্র তার আচরণে
যুদ্ধ পরবর্তীকালে অনেক বেশী স্বৈর মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। এইরূপ পরিবর্তীত
পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অর্থনীতিকেও পরিস্থিতির সঙ্গে নতুনভাবে সমন্বয় সাধনের পন্থা
অনুসন্ধান করতে হচ্ছে। এইসূত্রেই সমালোচনাত্মক বিশ্লেষকগণ রাজনৈতিক সমাজবিদ্যা,
সাংস্কৃতিক পর্যালোচনা, দোষদর্শিক মনবিজ্ঞান ইত্যাদি সকল বিষয়কে তাদের আলোচনা
কাঠামোর অন্তর্ভূক্ত করে নেয়। এছাড়াও ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে
উপনীত হন যে পরিবর্ধিত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কসবাদের ব্যবহৃত বেশ কিছু
ধারণার, যেমন শ্রমবিভাগ, আমলাতন্ত্র, সাংস্কৃতিক ছাঁচ, পারিবারিক কাঠামো, এমনকি
মালিকানা ও মালিকানাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, ইত্যাদি বিষয়গুলির নয়া বিশ্লেষণ এবং
পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুল তাঁদের গবেষণার অন্যতম বিষয় হিসাবে
উৎপাদন পদ্ধতির সাম্প্রতিক জটিলতার প্রসঙ্গটির অবতারণা করে। তাঁরা বিশ্লেষণের
চেষ্টা করেন, কিভাবে উৎপাদন পদ্ধতির মধ্যস্থিত বিভিন্ন সামাজিক উপাদান, উৎপাদন
পদ্ধতির সামাজিক অর্থনৈতিক চরিত্রকে পরিবর্তীত করে বিশেষ কিছু ব্যক্তি-এজেন্টের
হস্তগত হয়ে পড়ে।
তাঁরা এই বিষয়টিকে প্রাথমিকভাবে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের
ব্যাখ্যা অনুসরণ করে, নিয়ন্ত্রণবাদ ও দৃষ্টবাদের সহায়তায় বিশ্লেষণ করার চেষ্টা
করেন, এবং উল্লেখ করেন ইতিহাসে এমন কিছু বিকল্পহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন সমাজ
ইতিহাসের যুক্তিসিদ্ধ গতিতে অগ্রসর হয় না ।পরিবর্তে স্বনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক
ভিত্তির দ্বারা নির্দেশিত হয়। এবং ইতিহাসের এই পর্যায়ে বা অবস্থানগুলিকে যথাযথভাবে
অনুসরণ ও বিশ্লেষণের জন্যে,প্রচলিত বিশ্লেষণ পদ্ধতির বাইরে গিয়ে, বিশ্লেষণের
উপযুক্ত বিজ্ঞাম সম্মত পদ্ধতির প্রয়োজন হয়। এরজন্যেই প্রয়োজন মননশীল
বস্তুতান্ত্রীক পর্যালোচনা। মার্কস অবশ্য তাঁর আলোচনায় মননশীল বস্তুতান্ত্রিকতার
কঠোর সমালোচনা করেছিলেন, এবং ভাবতান্ত্রিক চিন্তার একটি অঙ্গ হিসাবে মননশীল
বস্তুতান্ত্রিকতাকে বাতিল করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেনযে, বস্তুতান্ত্রিক জগত
সম্পর্কে ব্যক্তিকেন্দ্রীক মননশীলতা আসলে বাস্তব বিষয়ীগত দিককে অগ্রাহ্য করে। কিন্তু এটাও সত্যি
যে প্রধানত মার্কসীয় বিশ্লেষণ পদ্ধতির সহায়তায় সাম্প্রতিক বা বিশ্বযুদ্ধোত্তর
সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যেকার উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ককে যথাযথভাবে অনুসরণ
ও বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে না। অথবা তাদের দ্রুত পরিবর্তনের কারণু অনুমান করা যাচ্ছে
না। এইরূপ পরিস্থিতিতে ফ্র্যাঙ্কফুর্ট সামাজিক গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকদের কাছেই
প্রতীয়মান হয়, বস্তুগত অবস্থার অভ্যন্তরস্থ কার্যাব্লীর সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণই হল
একমাত্র উপায় যার দ্বারা অন্ততঃ যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর সামাজিক অর্থনৈতিক
রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের আংশিক কারণ অনুমান করা সম্ভবত সম্ভব হবে। গবেষক
বিশ্লেষকরা উপলব্ধি করে উৎপাদনের শক্তি বা
উপকরণের সাথে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্ধ্ব প্রতিষ্ঠিত বস্তুতান্ত্রিক বিশ্লেষণের
পরিপ্রেক্ষিতে অনুমান করা যাচ্ছে না, কারণ এই দুইয়ের মাঝখানে এমন অনেক সামাজিক
এজেন্ট ও তাদেরকার্যাবলীর অনুপ্রবেশ ঘটছে, যাতে এই দুই বৈরীমূলক উপাদান, উৎপাদন
ব্যবস্থায় তাদের পূর্বের সক্রিয়তাকে প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। এইরূপ
মতাদর্শগত সঙ্কটাবস্থায় যেটা প্রয়োজন, তা’হল পদ্ধতিগত পরিবর্তন ঘটিয়ে অবস্থার
পর্যালোচনা। যেমন বস্তব পরিস্থিতির সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রয়োজন
ব্যক্তিপরিচয়ের বিস্তৃত পর্যবেক্ষণ। কারণ যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে উদ্ভূদ
যে বাস্তবতা, তাকে সামাজিক দীপায়নের পশ্চাৎগামীতা বলে মনে করা হচ্ছে, এবং যাকে
প্রতিষ্ঠিত সামাজিক সংস্কৃতির বিপরীত মুখী বলে অনুমান করা হচ্ছে, তার মূলে আছে
ব্যক্তি শাসনের স্বৈরাচারীতা। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিশাসনে রীতি বর্হিভূত পদ্ধতি,
শাসনব্যবস্থার চিরন্তন মৌলিক কাঠামোকে ভেঙ্গে শাসনব্যবস্থার নতুন পদ্ধতিকে আমদানিই
শুধু করেনি, সামাজিক অর্থনীতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তিকে বাতিল করে নতুন রাজনৈতিক
ক্ষমতা কেন্দ্রীক স্বৈরাচারিতাকে প্রতিষ্ঠা করেছে। উৎপাদন শক্তি ও উপকরণের সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের ঐতিহাসিক দ্বন্ধ্ব, অর্থনৈতিক সঙ্কটকে সৃষ্টি
করা পরিবর্তে, অবশ্যম্ভাবী সঙ্কট এবং সমাধানের প্রকৃতিকেই বর্তমানে নিয়ন্ত্রিণের
মধ্যে নিয়ে নিয়েছে। কিছু স্মাজিকভাবে কার্যকরী শক্তি বা এজেন্ট, যারা সামাজিকভাবে
কার্যকরী প্রতিনিধি হিসাবে সঙ্কটকে যেভাবে দেখছে বা বিশ্লেষণ করছে, সেইভাবেই, তারা
সমাধানের পদ্ধতি নির্ধারণ করছে। সমালোচনাত্মক তাত্ত্বিকদের এইভাবেই বাস্তব অবস্থার
কাঠামো ও কার্যাবলির বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে বিষয় ও বিষয়ীগত অবস্থার বিশ্লেষণ করা
কথা বলেন।
হর্কমায়ার তাঁর দীপায়নের দ্বন্ধ্ব নামক প্রকল্পে যেটা
বোঝাতে চেয়েছিলেন যে গবেষণার সমালোচনাত্মক দর্শন, বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনায়
শৃঙ্খলাবদ্ধ বিজ্ঞানের ওপর আস্থা রেখতে পারছেন না, কারণ এর সাহায্যে যুদ্ধ ও
যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর পরিবর্তনের ঐতিহাসিক কারণকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। প্রথম ও
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল , তার বৈশিষ্ট্য
ছিল বিজ্ঞান, বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও দর্শন এবং নয়া প্রযুক্তি। এদের ক্রমাগত বিকাশের
ফলে ক্রমেই উৎপাদন পদ্ধতি ও সামাজিক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রায় অবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কার্যক্ষেত্রে এ’ও প্রমানিত হয়, দীপায়িত ও যৌক্তিক হিসাবে যে চিন্তা ও প্রকল্পগুলিকে
চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেইগুলিও মিথ ও অযৌক্তিক্তা থেকে পৃথক ছিল না। যুক্তির অতীত
যে রহস্যময়তা, তার থেকে দিপায়ন ও বিজ্ঞান তার সম্প্রসারিত জ্ঞানের সাহায্যে
ব্যক্তি সমাজকে মুক্ত করে সংস্কৃতি ও জ্ঞানের মেলবন্ধনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
মানুষের জঙান উৎপাদন দক্ষতা, সামাজিক দক্ষতা ইত্যাদির ওপর গাণিতিক মান চাপিয়ে
দিয়ে সবধরণের পণ্যকে বিমূর্ত শ্রম সময়ের
এককে রূপান্তরিত করার ফল স্বরূপ প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। এই কমার প্রাথমিক
ফল হল, প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। একইভাবে ব্যক্তি মানুষের উপর ক্রমবর্ধমান
নিয়ন্ত্রণের অনিবার্য ফল হল, তাদের শ্রমের থেকে তাদের কর্তৃত্বের বিচ্ছিন্নতা।
সাধারন নিয়মানুসারে কোন বস্তুর ওপর যতটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়, সেই বস্তু
সম্পর্কে ততটাই জানা সম্ভব। কারণ দীপায়নের দ্বারা নির্মিত জ্ঞানতত্ত্ব অনুসারে, “আমরা
কোন বস্তুকে ততদুর পর্যন্তই জানতে পারি যতদূর পর্যন্ত আমরা তার ওপর ক্ষমতার
বিস্তার করতে পারব”।
১৯৩০ এবং ১৯৪০ সালের মধ্যে হর্কমেয়ারের নির্দেশাধীন
সামাজিক গবেষণার বিষয়বস্তুতে শুধু বৈচিত্র্যই ছিল না, গবেষকরাও সমাজের বিভিন্ন
দিককে তাঁদের গবেষণার অন্তর্ভূক্ত করতেন। যেমন সমাজে ব্যক্তির ব্যক্তিগত পরিচয়ের
মূল্য বা গুরুত্ব, পরিবার গঠনে সামাজিক প্রথা, এবং বৈচিত্র্য, পারিবারিক সম্পর্ক,
আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে, আমলাতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের
সম্পর্ক, অর্থনীতি সংস্কৃতি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় গবেষকদের গবেষণার বিষয়বস্তু
হিসাবে উঠে আসে। প্রসঙ্গত ফ্যাঙ্কফুর্ট প্রতিষ্ঠান শুরু হয়েছিল মার্কসবাদের
স্বতঃসিদ্ধতাকে সামনে রেখে। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা যায়, গবেষণার বিভিন্ন
বিষয়বস্তুতে গবেষকরা সেই স্বতসিদ্ধতাকে শুধু এড়িয়েই চলছে না, বিরুদ্ধ কোন
স্বতঃসিদ্ধতাকে ভিত্তি করে গবেষণার প্রকল্প রচিত হচ্ছে। এমন কি বহু গবেষণার
সিদ্ধান্ত থেকে এটা বোধ হতে থাকে যে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের অনিবার্যতার কথা মার্কস
বলেছিলেন, তার বাস্তবায়নও অসম্ভব বলে বধ হচ্ছে। অথবা যদি বা’ কোন
সম্ভাবনার পথ থাকে, তবে সে পথেও বহু বাধা। পরিবর্তে যেটা বোঝা যায়, তা’হল,
প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার
সাম্প্রতিক রূপ ও উন্নতির কারন হিসাবে কিছু ভিন্ন (মার্কসের বিশ্লেষণ থেকে অবশ্যই)
উজ্জ্বলতর কারণের অনুসন্ধান করছেন। কারন
তাদের ব্যাখ্যায় প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল, এটা প্রমান করা যে, মার্কস যে ভবিষ্যৎ
পরিবর্তনের কথা অনুমান করেছিলেন, তার বাস্তবায়নের পথে বহু বাধা আছে, এবং বর্তমান
পরিস্থিতিতে তা কোনভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়। নীম্নে উল্লেখ করা বিশিষ্ট
বিষয়গুলিকেই তাদের মনে হয়েছিল, পুঁজিবাদের বর্তমান অবস্থায় উন্নতিকে অনুসরণ করার
পক্ষে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।
1.
গবেষকমন্ডলী অর্থনীতি ও রাজনীতির মধ্যে এক অখন্ড সম্পর্ক গড়ে ওঠার স্পষ্ট সম্ভাবনার
কথা বলেন। এই প্রবনতা তাঁরা উন্নত ও আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে লক্ষ্য করেন।
পুঁজিবাদ যত দ্রুত একচেটিয়া পুঁজিবাদে রূপান্তরীত হচ্ছে, ততই সে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক
হস্তক্ষেপের প্রবনতাকে বৃদ্ধি করতে তৎপর হয়ে উঠছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রও তার সমুদয় আইন
স্বীকৃত শক্তি নিয়ে একচেটিয়া পুঁজির সামাজিক
অর্থনৈতিক স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখতে এগিয়ে আসছে। কারন একচেটিয়া পুঁজির অংশ হিসাবে ফিন্যান্স
পুঁজি বা অর্থ পুঁজির সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র নিজে থেকেই গ্রহন করতে তৎপরতা দেখাচ্ছে।
এবং একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্বার্থানুযায়ী অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াকে পরিচালিত করছে।
2.
আধুনিক উন্নত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থনীতি ও রাজনিতির মধ্যে যত নৈকট্য বা
পারস্পরিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততই স্থানীয় উদ্যোগগুলির মধ্যে সরকারী আমলাদের ওপর
নির্ভর করার প্রবনতা , এবং আমলাতন্ত্রের বিচক্ষণতার ওপর পরিপূর্ণ আস্থা স্থাপনের
মানসিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর অন্য একটি কারণও ছিল। প্রতিটি স্থানীয় বা জাতীয়
উদ্যোগের পশ্চাতে থাকে রাষ্ট্রীয় পুঁজির অংশ। তাই সরকারী আমলাদের ওপর নির্ভর করাই
হল উদ্যোগপতিদের সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমানের কাজ। ফিন্যান্স পুঁজি বিনিয়োগের দিকে যত
না দৃষ্টিপাত করে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, পরিকল্পিত উদ্যোগের ওপর। সেই
বিচক্ষনতার উপর নির্ভর করে, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা অনুসারে উপাদান সমূহের সামাজিক বা
ব্যক্তিগত বন্টন প্রক্রিয়াকে স্বীকার করে নিচ্ছে।
Comments
Post a Comment